Monday , 20 May 2013
শিরোনাম
বাংলায় আমদানি হচ্ছে ব্রিটেনের সংস্কৃতি

বাংলায় আমদানি হচ্ছে ব্রিটেনের সংস্কৃতি

ছবিটা একটু কল্পনা করুন। ছাত্র প্রশ্ন করছে শিক্ষিকাকে, “ধর্ষণ কি ও কাকে বলে? কিভাবে ধর্ষণ করা হয়? সব যৌন সম্পর্কতেই মহিলারা অন্ত:সত্ত্বা হয় না কেন? কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে শারীরিক সম্পর্ক করলে সন্তান ধারন হবে না?” ইত্যাদি। কোনও ওভার স্মার্ট ছাত্রের এই প্রশ্নগুলির জবাবে কি উত্তর দেবেন শিক্ষিকা? বা ছাত্রীদের সমবেত প্রশ্নের জবাবে কি উত্তর দেবেন যুবক শিক্ষক? যদি কো এড স্কুল হয় তাহলে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের মধ্যে যে মস্করায় জড়াবে তা বলাই বাহুল্য। তখন শিক্ষক ক্লাস কিভাবে সামলাবেন? কিভাবে ছবি এঁকে বোঝাবেন কন্ডোম এইভাবে ব্যবহার করতে হয়?
না এটা কল্পিত ছবি নয়, বরং খুব শীঘ্রই ছবিটা রিলিজ হতে যাচ্ছে স্কুলে স্কুলে। উচ্চমাধ্যমিক সংসদের সভাপতি মুক্তিনাথ চট্বোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু করে দিয়েছে রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের কলাকূশলীরা। এখন থেকেই এ্যাড দেয়া শুরু হয়ে গিয়েছে মিডিয়াতে, বলা হচ্ছে, সময় বদলাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে মূল্যবোধের মাপকাঠিও। টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন থেকে চলচিত্র, পর্নোগ্রাফী টিন এজারদের হাতের মুঠোয় যাবতীয় তথ্য তালাশ। ফলে স্কুল শিক্ষার পাঠক্রমীবা তার বাইরে থাকবে কিভাবে! হাল আমলের প্রজন্ম নানা সমস্যার শিকার। তাই প্রয়োজন পড়–য়াদের সচেতনতা। আর সেই প্রস্তাবেই সায় দিয়েছেন উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সাংসদের সভাপতি তথা বর্তমান সরকার।
রাজ্য স্কুলের কিশোর-কিশোরীদের সিলেবাসে যৌনশিক্ষার অন্তর্ভুক্তি প্রস্তাবে সম্মতি একটা অবিশ্বাস্য খবর। মানব জীবন, মানব সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতির জন্যে মানুষের যৌন জীবন গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। কোন ভাবেই যৌনশিক্ষাকে উপেক্ষা বা অবহেলা করতে পারিনা। ইসলামী আদর্শে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। কিন্তু যৌনশিক্ষার নামে কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের অবাধ যৌন স্বাধীনতা বা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতার শিক্ষা দেয়াকে সমর্থন করতে পারি না। সরকার আসলে অজান্তে স্কুলে যৌনশিক্ষার মাধ্যমে এ সব জিনিসই শিক্ষা দিয়ে বিশৃঙ্খল সমাজকে স¤পূর্ণ ধবংস করে দিতে যাচ্ছে। এটা কোন অবস্থায়ই মেনে নেয়া যায় না। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সাংসদ জানিয়েছেন যে, দেশের মোট জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ বয়:সন্ধির কিশোর-কিশোরিরা তাদের যৌন চেতনার বিভিন্ন কৌতুহল নিরসন হবে এই শিক্ষায়। কিভাবে যৌন রোগ থেকে বাঁচা যায় তা শেখানো হবে। ব্যক্তিগত যৌন সমস্যাগুলি বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে। ভয়ংকর যৌনরোগগুলো জানতে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সাহায্য করবে। তবে এগুলো নতুন কোন কথা নয় বরং ইউরোপ-আমেরিকায় যৌনশিক্ষা চালু করার আগেই আবিস্কৃত কথারই পুনরাবৃত্তি। তবে পরীক্ষিত সত্যটা হল এই, এর ফলে ইউরোপ-আমেরিকা রোগমুক্ত এলাকার পরিবর্তে নিত্য-নতুন রোগের আবিষ্কর্তার খ্যাতি অর্জন করেছে। যৌনরোগ পাশ্চাত্যকে গ্রাস করেছে। বৈধ বৈবাহিক সম্পর্কের পরিবর্তে নিত্য-নতুন নামে অবৈধ যৌনচারই এখন ইউরোপ-আমেরিকার সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটেনে যৌনশিক্ষা বহু আগে চালু হওয়ার পরেও টিন এজার মেয়েদের অন্ত:সত্ত্বা হবার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এব্যাপারে ইউরোপ মহাদেশের শীর্ষস্থান দখল করেছে। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের যৌনশিক্ষার অভাব আছে। বরং সাউথাম্পটন ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গিয়েছে প্রতি ১০ জনের ৭ জন টিন এজার মর্নিং আফটার পিলের ব্যাপারে পুরোপৃরি ওয়াকিফহাল রয়েছে।
এবার একটু দেখা যাক পাশ্চত্যে যৌনশিক্ষা চালু করার প্রেক্ষাপট। একথা বলা যায়, সীমাহীন ভোগসর্বস্ব পুঁজিবাদ, নাস্তিকতাবাদী দর্শন মানুষকে স্বার্থপর ভোগসর্বস্ব জীবে পরিণত করেছে। ফলে ভোগের চুড়ায় পৌঁছানোর জন্য উলঙ্গপনা, ব্যভিচারখানা, ফ্রি-মিক্সিং এ নিজেদেরকে আবদ্ধ করেছে। এই অনিয়ন্ত্রিত যৌন জীবনাচারের হাত ধরে যখন এইডস্ সহ বহু মারনব্যাধি রোগ পাশ্চাত্যকে গ্রাস করতে শুরু করেছে তখনই ঘুম ভেঙেছে পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবিদের। এই মহামারি যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জন্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই চালু করতে হয়েছে স্কুলে যৌনশিক্ষা। কিন্তু ফল হল বিপরীত। ব্রিটেনে টিন এজারদের মধ্যে এত অন্ত:সত্বা বৃদ্ধি পেল যে, ২০১০ সালে প্রাইমারি স্কুল থেকে যৌনশিক্ষা চালু করা বাধ্যতামূলক করা হল। এককথায় বলা যায় পাশ্চাত্য নিজের খোড়া গাড্ডায় নিজেই পড়ে এখন উদ্ধারের জন্য হাত পা ছোড়াছুড়ি করছে।
এখন প্রশ্ন তাহলে এই মরন কুয়ো থেকে উদ্ধারের উপায় কি? ইসলামী জীবন দর্শনই একমাত্র পথ। এখানে সীমিত পরিসরে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ না থাকায় সংক্ষিপ্তরূপে আলোচনা হল, ইসলামী সংবিধানের নির্দেশ ‘তোমরা অশ্লীলতার ধারে কাছেও যেওনা।’ ইসলাম প্রাপ্ত বয়স্ক যুবক ও যুবতীদের একান্তে মেলামেশাকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছে। নারীর সম্মান রক্ষার্থে হিযাব তথা পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইসলামের এই নির্দেশনাগুলি যদি পালন করতে সচেষ্ট হয় তাহলে যুবক-যুবতীর মাঝে অবৈধ সম্পর্কের করুন পরিণতি এবং অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে আমাদের সমাজকে পবিত্র রাখতে আর কোন মাল-মসলা বা বিশেষ শিক্ষার (স্কুলে যৌনশিক্ষার) প্রয়োজন আছে কি? ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় যৌবনে যেমন অবিবাহিত থাকার সুযোগ নেই তেমনি ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়াও। মহম্মদ (সঃ) বলেন, তোমাদের বিবাহ করা উচিত। কারণ চক্ষুদ্বয়কে কু-দৃষ্টি হতে রক্ষা করতে এবং লজ্জাস্থানের রক্ষনাবেক্ষন করতে বিবাহ এক উৎকৃষ্ট পন্থা….।’ অন্যদিকে কুরআনের নির্দেশ, “ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়োনা। কারণ এটা একদিকে যেমন অশ্লীলতা অপরদিকে এক ভ্রান্ত পথ।”
পেঁচানো পার্বত্য পথের একদিকে গভির খাদ এবং অপরদিকে উচ্চ প্রস্তরময় প্রাচীর বাঁধানো থাকে। আর সেই পথের দুই কিনারাকে এমনসব প্রতিবন্ধক দ্বারা সুরক্ষিত করা হয় যাতে পথিক খাদের দিকে চলে যেতে না পারে। এসব প্রতিবন্ধক স্থাপনের উদ্দেশ্য কি পথিকের স্বাধীনতা হরন করা? নয়, তা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য শুধু তাকে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তাঁর সংবিধানে যে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন তার উদ্দেশ্যও এটাই।
যদি কেউ বা কোন সমাজ বা রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই সীমারেখা অতিক্রম করে কো-এডুকেশনের ব্যবস্থা করে, হিযাব ব্যবস্থাকে নিষিদ্ধ করে, অম্লীল পর্নোভিডিও সরবরাহ করে, ব্যভিচারালয়, বার-কে যদি আইনত স্বীকৃতি দেওয়া হয়, ফ্রি-মিক্সিং এর স্লোগান তোলা হয় তাহলে তো সেই ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র গাড্ডায় পড়া স্বাভাবিক ঘটনা। তাদের জন্য পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের আগে মৃত্যুই অপেক্ষা করছে। ইসলামের এই সীমারেখাগুলিকে সঠিক মর্যাদা দেয়া হলে মরা লাশ কুড়াতে বা উদ্ধার করতে এত সময়, অর্থ, মেধা ব্যয় করতে হত না পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থাকে।
পরিশেষে বলি প্রকৃতিগতভাবে মানুষ যেরকম খাওয়া পরার জ্ঞান অর্জন করে তেমনি কিছুটা যৌনশিক্ষাও লাভ করে। একটা বাচ্চাকে শেখাতে হয়না মাংসের টুকরো সামনের দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হয় আর মটরদানা মাড়ির দাঁত দিয়ে ভাঙতে হয়। জৈবিক জীবন যাপনের জন্য এরপর যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের প্রয়োজন তা তারা পরিবার-নিকট আত্মীয়র কাছ থেকে লাভ করতে পারে।সুস্থ, সভ্য সমাজব্যবস্থায় যৌনশিক্ষা বলতে এ বয়সে আর কি কিছু বেশি প্রয়োজন আছে? এই অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অহেতুক নাড়াচাড়ার অর্থ হল প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলির আলোচনার সময় কেটে নেয়া। সুতরাং টাকা চেনার মত সহজ বিষয়কে নিয়ে জলঘোলা না করে বরং প্রকৃত কোন পথে, কিভাবে সমাজে শান্তি, শিক্ষাঙ্গনে নৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব সে ব্যাপারে চিন্তভাবনা করা বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। ****

Scroll To Top